জীবন কখনো কখনো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ সংগঠন) সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের জীবনে এখন সেই করুণ বাস্তবতা। একদিকে প্রিয়তমা স্ত্রী ও দুধের শিশুর অকাল মৃত্যু, অন্যদিকে আইনি মারপ্যাঁচে কারাগারের চার দেয়াল—সব মিলিয়ে এক চরম ট্র্যাজেডির নাম এখন সাদ্দাম।
হাইকোর্ট থেকে জামিন, তবুও কারাফটকই শেষ গন্তব্য
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) মানবিক দিক বিবেচনা করে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সাদ্দামকে ৬ মাসের জামিন প্রদান করেন। তার আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা জানান, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জামিন মেলায় এখন সাদ্দামের মুক্তিতে আর কোনো আইনি বাধা নেই। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, জামিননামা জেলগেটে না পৌঁছানোয় সোমবার রাতেও তাকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠেই কাটাতে হয়েছে।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহমেদ জানিয়েছেন, “আদালতের আদেশ থাকলেও আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র হাতে না পাওয়া পর্যন্ত তাকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়। কাগজপত্র এলেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।”
অ্যাম্বুলেন্সে শেষ দেখা: পাঁচ মিনিটের সেই আর্তনাদ
সাদ্দামের এই জামিন এমন এক সময়ে এল যখন তিনি মানসিকভাবে পুরোপুরি বিধ্বস্ত। গত ২৪ জানুয়ারি এক নজিরবিহীন দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিল যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার ফটক। কারাগারের লোহার খাঁচায় বন্দি থাকা সাদ্দামকে মাত্র ৫ মিনিটের জন্য তার মৃত স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী এবং ৯ মাস বয়সী শিশুপুত্র নাজিমের মরদেহ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
প্যারোল মঞ্জুর না হওয়ায় কারাগারের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই প্রিয়জনদের শেষ দেখা দেখতে হয়েছে তাকে। সেই সময়কার হৃদয়বিদারক দৃশ্য এবং সাদ্দামের আহাজারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় তুলেছিল।
প্রেক্ষাপট: আত্মগোপন থেকে ট্র্যাজেডি
গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাদ্দাম কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন। পরে গোপালগঞ্জ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে যশোর কারাগারে পাঠানো হয়। বন্দি থাকাকালীন গত কয়েকদিন আগে বাগেরহাটের নিজ বাড়ি থেকে তার স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া
পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, সাদ্দামের প্রতি যে মানবিকতা হাইকোর্ট দেখিয়েছেন, তা যদি স্ত্রী-সন্তানের দাফনের সময় দেখানো হতো তবে হয়তো পরিস্থিতির করুণতা কিছুটা কম হতো। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, কখন পৌঁছাবে সেই কাঙ্ক্ষিত জামিননামা আর কখন সাদ্দাম ফিরবেন তার শূন্য ভিটায়, যেখানে আর কোনোদিন তাকে ডাকবে না তার ৯ মাসের সন্তান।
রবি ডাকুয়া/বাগেরহাট প্রতিনিধি
