ইট–সুরকির গাঁথুনির চেয়েও শক্ত যার ভিত্তি, সেটি মানুষের অটুট বিশ্বাস। কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ আজ আর শুধু একটি উপাসনালয় নয়—এটি হয়ে উঠেছে মানুষের আশা, আকুতি আর নির্ভরতার এক অনন্য প্রতীক।
দীর্ঘ ৩ মাস ২৭ দিনের নীরবতা ভেঙে শনিবার সকালে আবারও খুলে দেওয়া হলো পাগলা মসজিদের দানবাক্স। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা গণনা শেষে পাওয়া গেছে ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা। ১০টি দানবাক্স ও ৩টি সিন্দুক থেকে বেরিয়ে আসে ৩৫ বস্তা টাকা। এর পাশাপাশি পাওয়া গেছে স্বর্ণ, রৌপ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা।
রাত ৮টার দিকে দানের টাকার পরিমাণের সত্যতা নিশ্চিত করেন কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজাবে রহমত।
বিশ্বাসের ঠিকানা পাগলা মসজিদ
পাগলা মসজিদে দান মানে শুধু অর্থ প্রদান নয়। এখানে মানুষ রেখে যায় তার না বলা কষ্ট, অস্ফুট প্রার্থনা আর ভবিষ্যতের আশা। বিশ্বাস আছে—এখানে দান করলে মনের বাসনা পূরণ হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন।
দান হিসেবে দেওয়া হয় টাকা ছাড়াও স্বর্ণালংকার, বৈদেশিক মুদ্রা, কোরআন শরিফ, মোমবাতি, আগরবাতি, হাঁস, মুরগি, ছাগলসহ বিভিন্ন গবাদি পশু। প্রতিদিন আসরের নামাজের পর এসব দানকৃত সামগ্রী নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়।
কড়া নিরাপত্তায় গণনা কার্যক্রম
শনিবার সকাল ৭টায় কড়া নিরাপত্তার বেষ্টনীতে দানবাক্সগুলো খোলা হয়। বস্তাবন্দী টাকা নিয়ে যাওয়া হয় মসজিদের দ্বিতীয় তলায়। সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় গণনা কার্যক্রম, যা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা ও পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন। গণনা থেকে শুরু করে ব্যাংকে টাকা পৌঁছানো পর্যন্ত সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় বলে জানান পুলিশ সুপার।
সাউন্ড ক্লিপ (১):
ড. এস এম ফরহাদ হোসেন
পুলিশ সুপার, কিশোরগঞ্জ
দানের অর্থে সমাজসেবা
মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানায়, দানের অর্থ দিয়ে স্থানীয় মসজিদ-মাদ্রাসায় সহায়তা, জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত অসহায় মানুষের চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি পাগলা মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি ইসলামিক কমপ্লেক্স স্থাপনের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে।
সাউন্ড ক্লিপ (২):
মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা
জেলা প্রশাসক ও সভাপতি, পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটি
বিশাল আয়োজনে গণনা
গণনায় অংশ নেন ৩৬০ জন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, ১৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ৩৩ জন শিক্ষক ও স্টাফ, ২০ জন সেনা সদস্য, ৩০ জন পুলিশ, ১০ জন আনসার ব্যাটালিয়ন, ৫ জন আনসার সদস্য এবং ১০০ জন ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী। যেন সংখ্যার হিসাব নয়, মানুষের বিশ্বাসের ওজন মাপা হচ্ছিল।
এর আগে চলতি বছরের ৩০ আগস্ট দানবাক্স খোলা হলে পাওয়া গিয়েছিল রেকর্ড ১২ কোটি ৯ লাখ ৩৭ হাজার ২২০ টাকা। সব মিলিয়ে বর্তমানে পাগলা মসজিদের ব্যাংক হিসাবে জমা রয়েছে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা।
পাগলা মসজিদ তাই আজও প্রমাণ করে—বিশ্বাস কখনো নিঃশেষ হয় না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও শক্ত হয়।
আশরাফুল ইসলাম রাজন/কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
