পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বিচ্ছিন্ন জনপদ চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন। যেখানে নদী আর মাটির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে হাজারো মানুষ। কিন্তু সেই জনপদে এখন প্রকৃতির চেয়েও বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস’। বিশেষ করে তরমুজের এই মৌসুমে সাধারণ চাষীদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবিতে আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় স্থানীয় খেয়াঘাট এলাকায় বিশাল মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন কয়েকশ ভুক্তভোগী নারী-পুরুষ।
প্রতি ‘তাওয়া’য় এক টাকা চাঁদা!
একজন প্রান্তিক কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনির ফসলে ভাগ বসাচ্ছে প্রভাবশালী চক্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক ক্ষোভের সাথে জানান, তরমুজ খেতের প্রতি ‘তাওয়া’ (চারা রোপণের গর্ত) তৈরি করে তাঁরা যদি ৩ টাকা পান, তবে সেখান থেকে ১ টাকা কেড়ে নিচ্ছে ‘রুহুল বাহিনী’। চাঁদা না দিলে জোটে অমানুষিক মারধর। কেবল তাই নয়, কৃষকের জমি জোরপূর্বক দখল করে বহিরাগতদের কাছে লাখ লাখ টাকায় লিজ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে।
কার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ?
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীদের আঙুল উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি মো. রুহুল রাঢ়ীর (৪২) দিকে। বক্তাদের অভিযোগ, রুহুল রাঢ়ী ও তাঁর বাহিনীর অত্যাচারে চন্দ্রদ্বীপের সাধারণ মানুষ দিশেহারা। অবৈধ বালু উত্তোলন থেকে শুরু করে জমি দখল—সবখানেই তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য। প্রতিবাদ করলেই কপালে জোটে মিথ্যা মামলা আর শারীরিক নির্যাতন।
চন্দ্রদ্বীপের চরওয়াডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. আহসান হাবিব বলেন, “এখানের মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। কৃষি আর মাছ ধরাই তাদের একমাত্র সম্বল। সেখানেও যদি প্রতিনিয়ত চাঁদা দিতে হয়, তবে তারা যাবে কোথায়?” তিনি আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন নীরবে সহ্য করলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে মানুষ এখন সাহস করে রাজপথে নামছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
স্থানীয় বিএনপির এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন যে, রুহুল রাঢ়ীর কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে সাধারণ মানুষ দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রুহুল রাঢ়ী। তাঁর দাবি, “আওয়ামী লীগ আমলে যারা অত্যাচার করেছে, তারাই এখন আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। যারা মানববন্ধন করেছে তারা মূলত জামায়াত ও আওয়ামী লীগের লোক।”
প্রশাসনের ভূমিকা
বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত। তবে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
উপসংহার
পটুয়াখালীর এই উর্বর চরাঞ্চল যখন তরমুজের ফলনে সেজে ওঠার কথা, তখন চাষীদের চোখেমুখে শ্রাবণের মেঘ। সাধারণ মানুষের দাবি—রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের হাত থেকে এই জনপদকে মুক্ত করতে দ্রুত প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
এইচ এম বাবলু/পটুয়াখালী প্রতিনিধি
