বাংলার ইসলাম প্রচারের ইতিহাসে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর এক অনন্য নাম, যেখানে শায়িত আছেন প্রভাবশালী আউলিয়া হযরত মখদুম শাহদৌলা (রহ.)। সুলতানী আমলে নির্মিত ১৫ গম্বুজ বিশিষ্ট এই প্রাচীন শাহী মসজিদ আজও তার অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ নিয়ে দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে চলেছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর বিশ্বাসের এক মিলনস্থল এই 'মখদুমিয়া জামে মসজিদ' ও সংলগ্ন মাজার শরিফ।বিস্ময়কর স্থাপত্য! ১৫টি গম্বুজ আর ২৪টি কালো পাথরের স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আছে এই প্রাচীন মসজিদ।

বাংলার মাটিকে ইসলামের আলোয় আলোকিত করতে সুদূর আরব থেকে যেসব আউলিয়া-দরবেশ এ দেশে পা রেখেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহ.)। সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরের দরগাপাড়ায় অবস্থিত তাঁর স্মৃতিধন্য মাজার ও সংলগ্ন প্রাচীন ‘মখদুমিয়া জামে মসজিদ’ আজও আটশ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।

এক অলৌকিক যাত্রার ইতিহাস

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১১৯২ থেকে ১১৯৬ সালের মধ্যে ইয়ামেন প্রদেশের শাসনকর্তার বংশধর শাহজাদা মখদুম শাহদৌলা (রহ.) সাতটি বিশাল জাহাজ নিয়ে ধর্ম প্রচারে বের হন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর তিন ভাগ্নে ও একদল একনিষ্ঠ অনুসারী। বোখারায় গিয়ে বিখ্যাত সুফী জালাল উদ্দিন বোখারীর (রহ.) কাছ থেকে এক জোড়া ধূসর বর্ণের ‘জালালী কবুতর’ উপহার নিয়ে তাঁরা জলপথে বাংলার এই জনপদে এসে পৌঁছান।

কথিত আছে, দিগন্তবিস্তৃত জলরাশির মাঝে কবুতরগুলোর পায়ে পলিমাটির সন্ধান পেয়ে তাঁরা বুঝতে পারেন কাছেই চর জেগেছে। সেই চরের নামই পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারে রাখা হয় ‘শাহজাদপুর’।

স্থাপত্যশৈলীর এক বিস্ময়কর নিদর্শন

সুলতানী আমলে নির্মিত এই মসজিদটি প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য উদাহরণ।

  • গম্বুজ ও স্তম্ভ: কালো পাথরের মোট ২৪টি বিশাল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এই মসজিদের ১৫টি গম্বুজ।
  • কারুকার্য: মসজিদের ভেতরে ও বাইরে পোড়ামাটির ফলমূল ও লতাপাতার সূক্ষ্ম কারুকার্য আজও দর্শনার্থীদের চোখ জুড়ায়।
  • দেওয়াল: প্রায় ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি পুরু দেওয়ালগুলো জানান দেয় সেই সময়ের নির্মাণশৈলীর দৃঢ়তা।

প্রতিটি গম্বুজের মাথায় পিতলের কারুকার্য এবং ছোট ইট, চুন-শুরকির এই গাঁথনি পর্যটক ও ইতিহাসবেত্তাদের মুগ্ধ করে। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত রয়েছে।

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও শাহাদাত

ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে মখদুম শাহদৌলা (রহ.)-কে তৎকালীন রাজা বিক্রম কেশরীর প্রবল বাধার মুখে পড়তে হয়। দীর্ঘ লড়াই ও ৩৩ বার যুদ্ধের পর, এক নব-মুসলিম ছদ্মবেশী ঘাতকের হাতে নামাজরত অবস্থায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর কাটা মস্তক যে স্থানে সমাহিত করা হয় তা ‘ছের মোকাম’ নামে পরিচিত, আর দেহ মোবারক দাফন করা হয় এই মসজিদের দক্ষিণ পাশেই।

বর্তমান ও ঐতিহ্য

বর্তমানে এই মখদুমিয়া জামে মসজিদটি কেবল ঐতিহাসিক নিদর্শনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। প্রতি শুক্রবার দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন। প্রতি বছর চৈত্র মাসে এখানে দুই দিনব্যাপী বিশাল ওরশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে লক্ষাধিক ধর্মপ্রাণ মানুষের সমাগম ঘটে।

মসজিদের ইমাম মোঃ আকবর আলী বলেন, “এই পবিত্র স্থানে ইমামতি করতে পেরে আমি গর্বিত। জুমার দিনে এত মুসল্লি হয় যে, অনেক সময় তিল ধারণের জায়গা থাকে না। আমাদের এই প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারের আরও জোরালো নজর প্রয়োজন।”

যাতায়াত ব্যবস্থা

রাজধানী ঢাকা থেকে বাসে করে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর বিসিক বাসস্ট্যান্ডে নেমে রিকশা বা সিএনজিযোগে খুব সহজেই পৌঁছানো যায় এই ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদে।

জুবায়ের হাসান/শাহজাদপুর প্রতিনিধি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *