ইতালিতে জন্ম হলেও যার মস্তকে ছিল রবীন্দ্রনাথ আর অন্তরে লালন, সেই অকৃত্রিম মানবতাবাদী ফাদার মারিনো রিগনকে ছাড়া আজ মোংলাকে কল্পনা করাও অসম্ভব। সুন্দরবনের নোনা জল আর উপকূলের মানুষের হাসিকান্নায় জড়িয়ে থাকা এই মহান সাধকের ১০১তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে বিনম্র শ্রদ্ধায়। বৃহস্পতিবার সকালে মোংলার সেন্ট পল্স ক্যাথলিক চার্চের সমাধি চত্বর যেন পরিনত হয়েছিল এক মিলনমেলায়, যেখানে সর্বস্তরের মানুষ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন তাদের ‘আলোর দিশারি’কে।
অন্ধকার থেকে আলোর পথে
পঞ্চাশের দশকে যখন সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি, তখন এই বিদেশি ধর্মযাজক গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে স্কুলে আসার প্রেরণা জুগিয়েছেন। স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, “ফাদার রিগন না এলে এই অঞ্চলের হাজারো মানুষকে আজ অন্ধকারে থাকতে হতো। তিনি কেবল ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক।”
রবীন্দ্রনাথ ও লালনের ‘অঘোষিত রাষ্ট্রদূত’
বক্তারা ফাদার রিগনের সাংস্কৃতিক অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, তিনি ছিলেন ইতালিতে বাংলাদেশের অঘোষিত রাষ্ট্রদূত। রবীন্দ্রনাথের ৪৮টি বই এবং লালন সাঁইয়ের ৩৫০টি গান তিনি ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করে বিশ্বদরবারে বাংলার ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছেন। লালন সঙ্গীতের আধ্যাত্মিক সুর তাকে এতটাই টেনেছিল যে, তিনি এর মাঝে খুঁজে পেয়েছিলেন ঐশ্বরিক অনুভূতি।
নারীর ক্ষমতায়ন ও জনসেবা
সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাসের সভাপতিত্বে বক্তারা স্মরণ করেন ফাদারের বহুমুখী কর্মযজ্ঞকে। মোংলা অঞ্চলে ১৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং সেলাই কেন্দ্র স্থাপন করে তিনি কেবল শিক্ষা নয়, বরং অবহেলিত নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের পথ দেখিয়ে গেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু
ফাদার মারিনো রিগন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অকুতোভয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। যুদ্ধে তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব ও ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে। উপকূলের এই মাটির মায়ায় তিনি এতটাই বিভোর ছিলেন যে, শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁর মরদেহ ইতালি থেকে এনে এই বাংলার মাটিতেই সমাহিত করা হয়।
দিনভর নানা আয়োজন
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ১০১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কেক কাটা হয়। বিকেলে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ এবং সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফাদারের প্রিয় গান ও কথা স্মরণ করা হয়। সেন্ট পল্স উচ্চ বিদ্যালয়, মোংলা সরকারি কলেজসহ স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণে উৎসবটি হয়ে ওঠে আনন্দময় ও আবেগপূর্ণ।
উপসংহার: ফাদার মারিনো রিগন চিরকাল বেঁচে থাকবেন সুন্দরবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে, প্রতিটি শিক্ষিত মানুষের কলমে এবং উপকূলীয় নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে। তাঁর দেখানো মানবতার পথই হোক আজকের প্রজন্মের পাথেয়।
রবি ডাকুয়া | বাগেরহাট
