আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাগেরহাটের রাজনীতির মাঠ এখন উত্তপ্ত। জেলার চারটি সংসদীয় আসনেই বইছে ভোটের হাওয়া। তবে এবারের নির্বাচনে বাগেরহাটে বিএনপির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদেরই ‘ঘরের শত্রু’। চার আসনেই বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের বিপক্ষে লড়ছেন দলেরই প্রভাবশালী বিদ্রোহী প্রার্থীরা। আর বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে ভোটের হিসেবে অনেকটা নিরুদ্বিগ্ন ও ফুরফুরে আমেজে আছেন জামায়াত ইসলামীর প্রার্থীরা।
বিদ্রোহী প্রার্থীর চাপে কোণঠাসা বিএনপি
বাগেরহাটে এবারের নির্বাচনে মোট ২১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সবার নজর স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকে। বিশেষ করে বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক এমপি এম এ এইচ সেলিম একসঙ্গে তিনটি আসনে (বাগেরহাট-১, ২ ও ৩) স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির ভোট ব্যাংক মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এছাড়া বাগেরহাট-১ আসনে প্রকৌশলী মো. শেখ মাসুদ রানা এবং বাগেরহাট-৪ আসনে কাজী খাইরুজ্জামান শিপন বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে আছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে তাদের বহিষ্কার করা হলেও মাঠ পর্যায়ের গণসংযোগে তারা বেশ সক্রিয়, যা ধানের শীষের প্রার্থীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
জামায়াতের জন্য সুবর্ণ সুযোগ?
তৃণমূলের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির ভোট দুই বা তিন ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ার সরাসরি সুফল পেতে যাচ্ছে জামায়াত। দলটির প্রার্থীরা প্রতিটি আসনেই শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছেন।
- বাগেরহাট-১: জামায়াতের অধ্যক্ষ মাওলানা মো. মশিউর রহমান খান এখন বড় ফ্যাক্টর।
- বাগেরহাট-২: শেখ মনজুরুল হক রাহাতের অবস্থানও বেশ সংহত।
- বাগেরহাট-৩: অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ শেখ তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিচ্ছেন।
- বাগেরহাট-৪: অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আলীমের পাল্লাও ভারী হচ্ছে বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বে।
আসনভিত্তিক লড়াইয়ের চিত্র
- বাগেরহাট-১ ও ৪: এই দুটি আসনে বিএনপি বেছে নিয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুই প্রভাবশালী মুখ—কপিল কৃষ্ণ মন্ডল এবং সোমনাথ দে-কে। কিন্তু নিজ দলের বিদ্রোহীদের মোকাবিলা করে জামায়াত প্রার্থীদের টপকানো তাদের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- বাগেরহাট-২ ও ৩: ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন এবং ড. শেখ ফরিদুল ইসলামকেও লড়তে হচ্ছে সাবেক এমপি এম এ এইচ সেলিমের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীর বিপক্ষে।
নেতাকর্মীদের শঙ্কা ও ষড়যন্ত্রের ঘ্রাণ
বাগেরহাট জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মোজাফ্ফর রহমান আলম এই পরিস্থিতিকে একটি ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় নেতাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে কাজ চলছে। তবে সাধারণ কর্মীদের মনে ভয়—এই অন্তর্কলহ শেষ পর্যন্ত চারটি আসনেই বিএনপির ভরাডুবির কারণ হয়ে দাঁড়ায় কি না।
উপসংহার: বাগেরহাটের নির্বাচনী লড়াই এখন কেবল ধানের শীষ বনাম অন্য প্রতীক নয়, বরং এটি বিএনপির টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। বিদ্রোহীরা যদি মাঠ না ছাড়েন, তবে বাগেরহাটের রাজনৈতিক মানচিত্র এবার বড় কোনো চমক দেখতে পারে—যেখানে জামায়াত প্রার্থীরা ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে জয়ী হয়ে আসতে পারেন।
রবি ডাকুয়া/বাগেরহাট প্রতিনিধি
