সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে হরিণ শিকারের জন্য চোরা শিকারিদের পাতা ফাঁদ এখন রূপ নিচ্ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য নীরব মৃত্যুফাঁদে। একদিকে সরকারি অর্থায়নে বাঘ গণনা ও পরিকল্পনা, অন্যদিকে সংরক্ষণে ঘাটতি—এই বৈপরীত্য নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীদের।
সম্প্রতি সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের মোংলা উপজেলার শরকির খালসংলগ্ন এলাকায় হরিণ ধরার জন্য পাতা একটি ছিটকা ফাঁদে আটকে পড়ে একটি বাঘ। গুরুতর আহত অবস্থায় বন বিভাগের তৎপরতায় বাঘটি উদ্ধার করা হয় এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে—এমন কত বাঘ নিঃশব্দে প্রাণ হারিয়েছে, যার কোনো হিসাব নেই?
আগেও ঘটেছে ভয়াবহ পরিণতি
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী,
- ২০১২ সালে ফাঁদে আটকে একটি বাঘ তার পা হারায়
- ২০১৪ সালে ফাঁদ ছিঁড়ে বেরিয়ে এলেও পরে আরেকটি বাঘ মারা যায়
এগুলো কেবল নথিভুক্ত ঘটনা; বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চার ধরনের ফাঁদ, একটাই পরিণতি—বিপদ
সুন্দরবনে হরিণ শিকারে ব্যবহার হচ্ছে চার ধরনের ফাঁদ—
- মালা ফাঁদ (সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত)
- ছিটকা ফাঁদ
- হাঁটা ফাঁদ
- গলা ফাঁদ
নাইলনের রশি দিয়ে তৈরি এসব ফাঁদ ভূমি থেকে অল্প উঁচুতে পাতা হয়। হরিণের গলা বা পা আটকে গেলেও অনেক সময় বাঘও এসব ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে, ফলে ঘটে অঙ্গহানি কিংবা মৃত্যু।
বিপন্ন হচ্ছে খাদ্যশৃঙ্খল
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের জন্য সপ্তাহে অন্তত ৫০–৬০ কেজি ওজনের একটি হরিণ প্রয়োজন। কিন্তু নির্বিচারে হরিণ শিকারের কারণে—
- একদিকে কমছে বাঘের প্রাকৃতিক খাদ্য
- অন্যদিকে বাড়ছে লোকালয়ে বাঘের প্রবেশের ঝুঁকি
২০২৪ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি। সরকার ঘোষিত ‘টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৮–২০২৭)’ অনুযায়ী, একটি বাঘ টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন কমপক্ষে ৫০০ হরিণ।
উদ্ধার পরিসংখ্যান বলছে ভয়াবহ চিত্র
গত আট মাসে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে উদ্ধার করা হয়েছে—
- ৬১,০১০ ফুট মালা ফাঁদ
- ৩৮০টি ছিটকা ফাঁদ
- ২,০০০টি হাঁটা ফাঁদ
পশ্চিম বিভাগে গত দুই বছরে উদ্ধার—
- ১,২০০ ফুট মালা ফাঁদ
- ৭৪৮টি হাঁটা ফাঁদ
এ ছাড়া দুই বিভাগে উদ্ধার করা হয়েছে ১,১৪৮ কেজি হরিণের মাংস।
আইনগত ব্যবস্থা হলেও উদ্বেগ কাটছে না
পূর্ব বন বিভাগ ২২টি মামলায় ৬৯ জনকে আসামি করে ৬২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। পশ্চিম বিভাগে ৫০টি মামলায় আসামি ১৩০ জন, গ্রেপ্তার মাত্র ১৯ জন।
বন কর্মকর্তারা বলছেন, টহল বাড়ানো হয়েছে, রয়েছে স্মার্ট প্যাট্রল টিম। তবে জনবল, নৌযান ও স্থানীয় সচেতনতার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
প্রাণিবিদ ও বাঘ বিশেষজ্ঞদের মতে,
“হরিণের জন্য পাতা ফাঁদ এখন বাঘের জন্য অন্যতম বড় হুমকি। সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া বাঘটি স্থানীয় বনজীবীদের চোখে না পড়লে হয়তো আরেকটি প্রাণ হারানোর ঘটনা যোগ হতো তালিকায়।”
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞ ও বন কর্মকর্তারা একমত—
- টহল আরও জোরদার করতে হবে
- পর্যাপ্ত জনবল ও নৌযান বাড়াতে হবে
- স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা জরুরি
- সচেতনতা ছাড়া সুন্দরবনের বাঘ রক্ষা সম্ভব নয়
রবি ডাকুয়া/বাগেরহাট প্রতিনিধি
